BISWAJIT PAUL

BISWAJIT PAUL
BISWAJIT PAUL
ফরাসি দার্শনিক, গণিতজ্ঞ ও বিজ্ঞানী রেনে দেকার্ত (René Descartes) ১৫৯৬ সালের ৩১ মার্চ লা এ-তে জন্মগ্রহণ করেন। তার হাত ধরে পাশ্চাত্য দর্শন নতুন এক যুগে প্রবেশ করে। তাই তাকে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের জনক বলা হয়। দর্শনে তার কাজের ক্ষেত্র ছিল জ্ঞানতত্ত্ব, অধিবিদ্যা ও নীতিবিদ্যা। তার হাত ধরেই কার্তেজীয় পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাকে এনালাইটিক্যাল জিওমেট্রির জনকও বলা হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি জ্যামিতি ও বীজগণিতের সম্পর্ক দেখান। এছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে।
রেনে দেকার্তের বাবার নাম জোয়াকিম দেকার্ত এবং মা জান ব্রোশার। তার বাবা ছিলেন উকিল ও ম্যাজিস্ট্রেট। দেকার্তের জন্মের দুই মাস পর মা মারা যান। এরপর দেকার্ত এবং তার অন্য দুই ভাই ও বোন দাদির কাছে বড় হন। পরবর্তী জীবনে জ্ঞানচর্চা ও জীবিকার কারণে দেকার্ত ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় বাস করেন।
দশ বছর বয়সের দিকে ১৬০৬ সালে কোলেজ রয়াল অঁরি-ল্য-গ্রঁ জেসুইট কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ১৬১৪ সাল পর্যন্ত পড়েন এবং ১৬১৫ সালে পোয়াতিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একবছর পর তিনি ধর্মতত্ত্ব ও আইনশাস্ত্রে ব্যাকলরিয়েট ডিগ্রি ও লাইসেন্স লাভ করেন।
তরুণ বয়সেই তার মধ্যে দার্শনিক প্রশ্ন জাগে। এ সময় থেকে তিনি দর্শন, বিজ্ঞান ও গণিত নিয়ে গভীরভাবে পড়তে থাকেন। তিনি সিদ্ধান্তে আসেন ইউরোপীয় মধ্যযুগ থেকে যে জ্ঞানের ধারা চলে এসেছে তা খুব নির্ভরযোগ্য নয়। তাই ঠিক করলেন সারা ইউরোপ ঘুরে বেড়াবেন, ঠিক যেমন সক্রেটিস অ্যাথেন্সের লোকের সঙ্গে কথা বলে জীবন কাটিয়েছিলেন। এ কারণে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ফলে মধ্য ইউরোপে কিছুদিন থাকার সুযোগ হয়। ১৬১৯ সালে তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন। এর পর প্যারিসে কাটান কয়েক বছর, তারপর ১৬২৯ সালে চলে যান হল্যান্ড। সেখানে গণিত আর দর্শন বিষয়ক লেখালেখি নিয়ে কাটিয়ে দেন প্রায় বিশ বছর। ১৬৪৯ সালে রাণী ক্রিস্টিনার আমন্ত্রণে তাকে দর্শন পড়াতে সুইডেন যান।
দেকার্তর হাত ধরে আধুনিক দর্শনে বুদ্ধিবাদের বিকাশ ঘটে। এরপর থেকে বুদ্ধিবাদ শক্তিশালী ধারা হিসেবে বিকাশ লাভ করে। তার বিপরীতে বিকাশ ঘটে অভিজ্ঞতাবাদ। দেকার্তের দার্শনিক জিজ্ঞাসার মূলে ছিল কোনো কিছুর জ্ঞানে কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়। তিনি দেখতে পান বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা উভয়কেই সংশয় করা যায়। তবে তিনি সংশয়বাদী ছিলেন না। তার সংশয় ছিল পদ্ধতিগত সংশয়বাদ। পরবর্তীতে জ্ঞানের সমস্যা সমাধানে তিনি একটি পদ্ধতির প্রস্তাব করেন। দেকার্তের মত অনুযায়ী, কোনো কিছুকে পরিষ্কারভাবে এবং ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত আমরা সেটাকে সত্য বলে ধরে নিতে পারি না। সেজন্য জটিল সমস্যাকে যতগুলো সম্ভব একক সমস্যায় ভেঙে নেওয়া দরকার। তখন সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজ ভাব থেকে আমরা চিন্তা শুরু করতে পারি। তাই দর্শনের অগ্রসর হওয়া উচিত সরল থেকে জটিলের দিকে। চিন্তা সূত্র আকারে তার বিখ্যাত উক্তি হলো ‘কোজিটো আরগো সাম’ বা আমি চিন্তা করি তাই আমি আছি। কেননা যতই সংশয় পোষণ করা হোক না কেন- সংশয় পোষণের জন্য চিন্তার কর্তাকে থাকতে হয়।
তাঁকে দ্বৈতবাদীও বলা হয়। কারণ তার দর্শন মতে দুই ধরনের বাস্তবতা বা সারবস্তু রয়েছে। একটি সারবস্তু হচ্ছে চিন্তা বা মন অন্যটি ব্যাপ্তি বা বস্তু। মন পুরোপুরি সচেতন এবং স্থানগত দিক দিয়ে কোনো জায়গা দখল করে না, ফলে এটাকে ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত করা যায় না। অন্যদিকে বস্তু জায়গা দখল করে এবং একে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অংশে ভাগ করা চলে। বস্তুর কোনো চেতনা নেই। দেকার্তের মতে দুই সারবস্তুই ঈশ্বর থেকে এসেছে। তিন্তু এ দুই সারবস্তুর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। এজন্য দেকার্তকে দ্বৈতবাদী বলা হয়। তবে দেহ-মনের দ্বৈততা সমাধানে তিনি পিনিয়াল গ্রন্থিরে কথা বলেন।
দেকার্ত লেখালেখি করতেন ল্যাটিন ভাষায়। পরবর্তীতে তার বইগুলো বিশ্বের প্রধান সব ভাষাতে প্রকাশ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - ইসাক বেকমানের সঙ্গে যৌথভাবে আ ট্রিটিজ অন মিউজিক অ্যান্ড দ্য এসথেটিকস অব মিউজিক (১৬১৮), রুলস ফর দ্য ডিরেকশন অব দ্য মাইন্ড (১৬২৬-২৮), দ্য সার্চ ফর ট্রুথ (১৬৩০-৩১), ডিসকোর্স অন দ্য মেথড (১৬৩৭), জিওমেট্রি (১৬৩৭), মেডিটেশনস অন ফার্স্ট ফিলোসফি (১৬৪১), প্রিন্সিপলস অব ফিলোসফি (১৬৪৪), দ্য ডেসক্রিপ্টশন অব দ্য হিউম্যান বডি (১৬৪৮) এবং প্যাশনস অব দ্য সোল (১৬৪৯)। এর মধ্যে ডিসকোর্স অন দ্য মেথড ও মেডিটেশনস অন ফার্স্ট ফিলোসফি বাংলায় অনূদিত হয়েছে।
সুইডেনে থাকাকালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৬৫০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রেনে দেকার্ত মৃত্যুবরণ করেন।
(সংগৃহীত, আন্তর্জাল থেকে)
----------
সদস্য-সদস্যাদের অনুরোধ করবো ছাত্রাবস্থায় পড়া রেনে দেকার্ত আবিষ্কৃত যে বিষয়টি তাঁর মনে পড়ে বা ভালো লাগতো সেটি উল্লেখ করতে।